কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অন্তরে শান্তি হাসিল হয়

আল কোরআন মানব জাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান। প্রত্যেক নবী ও রাসূলকে আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য কিতাব দান করেছেন। সে ধারায় সর্বশেষ নবী মোহাম্মাদ (সা.)-কে দান করেছেন আল-কোরআন।

আল-কোরআন এমন একটি ঐশী কিতাব যার ভাষা, ভাব, অলংকার, উপমা, ছন্দ, মূর্ছণা, ভাবের গভীরতা, অভিনব গ্রন্থনা, বাক্যের অনুপম বিন্যাস, মর্মস্পশী, সুর-ঝংকার, শাব্দিক দ্যোতনা ঈদৃশ গুনাবলী সব কিছু মিলে তার তুলনা হয় না। মোট কথা এর স্টাইল সম্পূর্ণ আল্লাহ প্রদত্ত।

এ কোরআন তেলাওয়াতের অনেক গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছ। নিম্নে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে বর্ণনা করা হলো-
কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অন্তরে শান্তি হাসিল হয়:

আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الَّذِينَ آمَنُواْ وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللّهِ أَلاَ بِذِكْرِ اللّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

‘যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর জিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তর সমূহ শান্তি পায়।’ (সূরা আর-রা‘দ ১৩:২৮)

হাদিসে এসেছে- বারা ইবনু আযিব (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি সূরা আল-কাহ্ফ তিলাওয়াত করছিল, আর তার পাশ্বে একটি ঘোড়া দু’টি রশি দিয়ে বাঁধা ছিল, তিলাওয়াত করার সময় একটি বাদলের মতো ছায়া এসে ঘোড়াটিকে ঢেকে দিল, আর ওই বাদল ধীরে ধীরে ঘোড়ার নিকটবর্তী হচ্ছিল। ঘোড়া তা দেখে লাফালাফি করতে লাগল, যখন সকাল হলো তখন ওই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট উপস্থিত হলো এবং তাকে ওই ঘটনা খুলে বলল তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, এ হলো শান্তি যা কোরআন তিলাওয়াতের কারণে অবতরণ করছিল।’ (সহীহুল বুখারি, হাদিস: ৫০১১)

কোরআন তেলাওয়াতকারী একটি অক্ষরে বিনিময়ে দশটি করে সওয়াব পাবে:

আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর কিতাব থেকে একটি অক্ষর তেলাওয়াত করল তার বিনিময়ে সে একটি নেকী পাবে, আর একটি নেকীর বদলা হবে দশগুণ, একথা বলছি না যে, আলিফ-লাম-মীম, একটি অক্ষর বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর, মীম একটি অক্ষর। (সুনান আত তিরমিযী, হাদিস: ২৯১০)

কোরআন তেলাওয়াকারী এবং সে অনুযায়ী ‘আমলকারী সর্বোত্তম মুমিন:

আবূ মূসা আল আশ‘আরী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করে তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআন তেলাওয়াত করে তার উদাহরণ হলো লেবুর মত তার স্বাদও ভাল আবার ঘ্রাণও ভাল। মুমিনের উদাহরণ হলো খেজুরের ন্যায়, তার স্বাদ ভাল কিন্তু কোনো ঘ্রাণ নেই, আর কোরআন তেলাওয়াতকারী পাপী ব্যক্তির উদাহরণ হলো ফুলের মতো ঘ্রাণ ভাল কিন্ত স্বাদ তিক্ত, আর কোরআন তেলাওয়াত নাকারী হাফেজের উদাহরণ হলো মাকাল ফলের মতো যার স্বাদ তিক্ত এবং সু-গন্ধ নেই।’ (সহীহুল বুখারী, হাদিস: ৭৫৬০)

কোরআন তেলাওয়াকারীর প্রতি হিংসা করাও সওয়াব পাওয়ার যোগ্য:

কোনো মানুষের প্রতি হিংসা করা শরীয়াতে বৈধ নয় কিন্তু যারা কোরআন তেলাওয়াত করে তাদের প্রতি হিংসা বৈধ। কেননা সে যদি তার অন্তরে পোষণ করে আমার অমুক ভাই এত সুন্দর করে কোরআন তেলাওয়াত করে আমি পারব না কেন এরকম হিংসা বৈধ করা হয়েছে। যেমন নিম্নের হাদিসটি উল্লেখযোগ্য-

‘আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুই ব্যক্তির প্রতি হিংসা করা বৈধ-(১) ওই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তায়ালা কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন আর সে তা দিনরাত তেলাওয়াত করে আর তার প্রতিবেশী তা শুনে বলে হায়! আমাকেও যদি এভাবে কোরআন মাজীদ শিখানো হত যেমন তাকে শিখানো হয়েছে, তাহলে আমিও এভাবে কোরআন তেলাওয়াত করতাম, (২) ওই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তয়ালা সম্পদ দিয়েছেন আর সে ওই সম্পদ মহান আল্লাহর পথে ব্যয় করতে থাকে, আর তার প্রতিবেশী তা দেখে বলে হায়! আমাকেও যদি তার মতো সম্পদ দেয়া হত যেমন তাকে দেয়া হয়েছে তাহলে আমিও তার মতো মহান আল্লাহর পথে ব্যয় করতাম যেমন সে করছে।’ (সহীহুল বুখারী,-হাদিস: ৫০২৬)

ভালভাবে কোরআন তেলাওয়াতকারী কিয়ামতের দিন সম্মানিত ফেরেশাগণের সঙ্গে থাকবে:‘আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরআন তেলাওয়াত পারদর্শী ব্যক্তিরা সম্মানিত ফেরেশতাগণের সঙ্গে থাকবে। আর যারা আটকিয়ে কষ্ট করে কোরআন তেলাওয়াত করে তারা দ্বিগুণ সওয়াব পাবে।’ (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৯৮)কোরআন তেলাওয়াত করা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উত্তরাধিকারী যা তিনি মুসরিমদের জন্য রেখে গেছেন:

‘আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি একদা মদিনার বাজার অতিক্রম করার সময় দাঁড়িয়ে গেলেন এবং লোকদের সম্বোধন করে বললেন, হে বাজারের লোকেরা কোন জিনিস তোমাদেরকে আটকিয়ে রেখেছে? লোকেরা বলল, হে আবূ হুরায়রা এটা কেমন কথা? আবূ হুরায়রা বলল, ওখানে নবী (সা.) এর মিরাস (সম্পত্তি) বন্টন হচ্ছে আর তোমরা এখানে বসে আছ? তোমরা কেন ওখানে যাচ্ছ না? আর নিজেদের অংশ গ্রহণ করছ না? লোকেরা জিজ্ঞেস করল সম্পত্তি কোথায় বন্টন হচ্ছে? আবূ হুরায়রা (রা) বলল, মসজিদে। লোকেরা দ্রত মসজিদে গেল, আবূ হুরায়রা (রা.) ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকলেন, লোকেরা মসজিদ থেকে ফিরে আসল, আবূ হুরায়রা (রা.) তাদেরকে জিজ্ঞেস করল কী হলো তোমরা ফিরে আসলে কেন?

লোকেরা বলল, আমরা মসজিদে গেলাম কিন্ত ওখানে কোনোকিছু বন্টন হতে দেখলাম না, তাই আমরা ফিরে আসলাম। আবূ হুরায়রা (রা.) লোকদেরকে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কি মসজিদে কাউকে দেখো নি? লোকেরা বলল, কেন নয় আমরা ওখানে কিছু লোককে নামাজ আদায় করতে দেখেছি, আবার কিছু লোক কোরআন মাজীদ তেলাওয়াত করছে, আবার কিছু লোক হালাল হারামের মাসয়ালা-মাসায়েল বর্ণনা করছে। আবূ হুরায়রা (রা.) বলল, তোমাদের অবস্থা দেখে আমার আফসোস হচ্ছে, এটাইতো রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মিরাস (সম্পত্তি)। (মু‘জামুল আওসাত, হাদিস: ১৪৩০)