পাহাড় ঝর্ণা গুহা- তিনে মিলে সোনাইছড়ি

দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের দামালদের ভ্রমণে প্রথম পছন্দই পাহাড়, ঝিরি, ঝর্ণা কিংবা ঘুটঘুটে অন্ধকারাচ্ছন্ন কোনো গুহার প্রান্তর। সেই লক্ষ্যেই ছুটে যাই সোনাইছড়ি ট্রেইলে। রাত্রের প্রথম প্রহরেই গাড়ি ছাড়ি। চট্টগামের ফাঁকা সড়কে মাইক্রো ছুটছে ধুমছে।

পথিমধ্যে নানান জায়গায় টি-ব্রেক মারতে মারতেও রাত পৌনে ৩টায় পৌঁছে যাই মিরসরাই মুরগির ফার্ম। গাইডকে ফোন দিতেই সে এসে হাজির। তাকে নিয়ে কয়েক কিলোমিটার দূরে হাদি-ফকির হাট দিয়ে গিয়ে রেললাইনের ধারে গাড়ি পার্কিং করা হয়। তখন রাত প্রায় শেষের দিকে। স্থানীয় জনৈক খাবার দোকানিকে ডেকে তুলে সঙ্গে নেওয়া বাড়তি মালছামানা তার ঘরে রাখা হয়।

এরপর ভ্রমণসঙ্গী স্বেচ্ছাসেবকরা পেঁয়াজ-মরিচ কাটাকুটিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। চড়িয়ে দেয়া হয় লাকড়ির চুলায় খিচুড়ি। রাঁধতে রাঁধতে সুবহেসাদেক। ওয়াক্ত অনুযায়ী ফজর নামাজ পড়ে গরম-গরম খিচুড়ি খেয়ে ট্র্যাকিং করার প্রস্তুতি। কিছুটা আলো ফুটতেই পাহাড় ঘেরা মেঠোপথে হাঁটতে শুরু করি। হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় পাথুরে ঝিরি, বোল্ডারের সান্নিধ্যে চলে যাই। শুরু হয় পাথুরে পিচ্ছিল পথে হাইকিং-ট্র্যাকিং।

ট্রেইলটা সোনাইছড়ি নামে পরিচিত। তবে শুরুতেই দেখব বাদুইজ্জাখুম; যা এই ট্রেইলের অন্যতম আকর্ষণ। বেশ কিছুটা সময় চড়াই-উতরাই শেষে বাদুইজ্জাখুমের সামনে পৌঁছি। ওমা! একি দেখছি? হাজার হাজার বাদুরের উড়াউড়ি। ভিতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাঝখানটা ফাঁকা করে দুইপাশে উঠে গেছে খাড়া পাহাড়। গুহার ভিতর হতে বহমান পানীয় ধারা। কিছুটা পা বাড়াতেই কোমর পর্যন্ত পানি। পায়ের তলায় কর্দমাক্ত মাটি। হাই ভোল্টেজের টর্চের আলোয় সাহস করে আমরা এগোতে থাকি। মাথার উপর বৃষ্টির ধারার মতো বাদুরের বিষ্ঠা পড়তে থাকে। দম বন্ধ হওয়ার মতো উটকো গন্ধ।

এরইমধ্যে আমাদের কেউ একজন সাঁতার দিয়ে আরও এগিয়ে গিয়ে চিৎকার করে ডাকতে শুরু করল। আর ওমনি আমরা আরও কয়েকজন দিলাম সাঁতার। সরু গুহার ভিতর সাঁতরে গিয়ে যা দেখলাম, তাতে সবার চোখ চড়কগাছ। এক ফালি আলোয় যৌবনা ঝর্ণাধারা। উচ্ছ্বাস আর অপ্রত্যাশিত ঝর্ণার সৌন্দর্য দেখে যারপরনাই আনন্দে বিগলতি হয়ে যাই। দুঃখের ব্যাপার দাঁড়িয়ে ছবি তোলার মতো পরিস্থিতি ছিল না। থাক নাইবা তুললাম ছবি; না চাইতেই প্রকৃতির যে রূপ দেখেছি- তাইবা কম কী?

এরপর কিছুটা পথ ঘুরে এসে আবারো হাইকিং-ট্র্যাকিং। একের পর এক বেশ বড়সড় পাথুরে বোল্ডার অতিক্রম করে এগিয়ে চলছি। কিছুক্ষণ আগে যে গুহার ভিতরে ছিলাম এখন সেই বাদুইজ্জাখুমের ঠিক উপরেই। দৃষ্টির খুব কাছাকাছি হাজার হাজার বাদুড়ের উড়াউড়ি। তখন ভাবছিলাম গুহায় প্রবেশের কারণে হয়তো তারা বিরক্ত হয়ে অনবরত উড়ছে আর কিচিরমিচির করছে। কিন্তু এখন দেখলাম বাদুড়ের দল এমনিতেই সারাক্ষণ নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই আপন মনে ঘুরে-ঘুরে উড়ছে।

চলতি পথে অনেক দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যে চোখ আটকায়। কখনো কখনো সেই সব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য থমকে দাঁড়াই। বুক ভরা নি:শ্বাস আর ভালোলাগার স্মৃতি নিয়ে আবারো হাঁটা শুরু করি। চলতে চলতে ছোটবড় কিছু ক্যাসকেড, ঝিরি ও বুনোপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাই সোনাইছড়ি ঝর্ণায়।

আগের রাতে বৃষ্টি হওয়াতে ঝর্ণায় বেশ পানিপ্রবাহ ছিল। সকাল সকাল পৌঁছে যাওয়ায় আমরা ছাড়া আর কোনো পর্যটকের ভিড় ছিল না। তাই পরিবেশটাও ছিল বেশ নিঝুম। হালকার ওপর ঝাপসা স্যুপ খেয়ে নেমে যাই ঝর্ণার পানিতে অবগাহনে।

সোনাইছড়ি ঝর্ণার উচ্চতা খুব বেশি নয়। বড় জোড় ৪০-৫০ ফুট হবে হয়তো। তবে এর চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। ইচ্ছেমতো দেহ ভিজাতে ভিজাতে আড্ডাও চলে সমানতালে। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভ্রমণপিপাসুদের আনাগোনা বাড়তে থাকলে আমরাও ফিরতি পথ ধরি। ও হ্যাঁ, আগেই জানিয়ে রাখি- দে-ছুট বেশিরভাগ ভ্রমণেই যে পথে যায় সে পথে আর ফিরে না। তাতে প্রকৃতির নতুনত্ব কোনো সৌন্দর্য দেখার সুযোগ মিলে।

তাই বরাবরের মতো সোনাইছড়ি হতেও ভিন্নপথে এগোলাম। জঙ্গলাপূর্ণ পথে যেতে যেতে ঢালা পাহাড় সামনে পড়ে। সেটাকে টপকেই তবে লোকালয়ে ফিরতে হবে। খানিকটা বিরতি দিয়ে শুরু হলো ট্র্যাকিং। উঠতে উঠতে মনে হলো পাহাড়ের কিছুটা অংশ প্রায় ৮০ ডিগ্রি খাড়া। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এর উচ্চতা প্রায় ৮০০ হতে ১০০০ ফুট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। লকডাউনে পর্যটকদের পদচারণা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ঢালা পাহাড়ের প্রকৃতি বেশ নয়নাভিরামভাবে সেজে রয়েছে। পাহাড়টি আপন বলয়ে গুছানোর সুযোগ পেয়েছে। বন্ধুর পথই তার স্বাক্ষর।

দে-ছুট বন্ধুরা খাড়া পিচ্ছিল পথে জঙ্গলি ফুলপাতার গন্ধ শুকতে শুকতে চূড়ায় যখন পৌঁছি, তখন বেলা প্রায় সাড়ে ১২টা। এরপর প্রখর রৌদ্রে হাইকিং। কোনো বাতাস নেই। পুরো একটা গুমোট পরিস্থিতি। গাছের একটি পাতাও নড়ছে না। এমন অবস্থায় হঠাৎ করে বড় এক গাছের মূল মাথা মটমট করে ভাঙার আওয়াজ। জসিম আমাকে গাছটা দেখাল। তাকে বললাম দেখতো কোনো বন্য জন্তু দেখা যায় কিনা। আমিও গাছের আরো কিছুটা কাছাকাছি গিয়ে ভালো করে খেয়াল করলাম।

কিন্তু কিছুই চোখে পড়ল না। টনক ফিরল যখন দে-ছুটের কেউ একজন বলল, ভাই আপনি কি এখনো বুঝতে পারেন নাই। ব্যাস যা বুঝার বুঝে নিয়ে দ্রুত দোয়া-দরুদ পড়ে সটকে পড়লাম। ঘটনাটা আমাদের মন্থর গতির হাঁটায়, স্পিড জুগিয়েছিল বেশ। লোকালয়ে ফিরে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে ঘটনার সত্যতা পেলাম। এরপর ফেসবুকেও পোস্ট দিয়ে সোনাইছড়ি ট্রেইলে জ্বিনের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হলাম। সোনাইছড়ি এমন একটা রোমাঞ্চকর ট্রেইল, যেখানে এক ট্রেইলে গুহা, ঝর্ণা ও পাহাড় ট্র্যাকিংয়ের আনন্দ উপভোগ করা যায়। আর যদি কিসমত ভালো থাকে তাহলে তো হরর মুভি বাস্তবেও দেখা যেতে পারে।

যাতায়াত: ঢাকার বিভিন্ন বাস টার্মিনাল হতে চট্টগ্রামের বাস ছেড়ে যায়। নেমে যেতে হবে মিরসরাই। সেখান হতে অটো-সিএনজি করে হাদি ফকির হাট রেললাইন। এরপর হাঁটা। রেললাইন হতে সব মিলিয়ে ৬ ঘণ্টার মধ্যেই ঘুরে আসা সম্ভব।

টপস:
# সোনাইছড়ি ঝর্ণা খুব বেশি বড় নয়। সাধারণত এসব আকারের ঝর্ণা বান্দরবানের ট্রিপে ভালোভাবে খেয়ালও করি না। কিন্তু সোনাইছড়ি ট্রেইলটা ঢাকার ধারে-কাছে হিসেবে বেশ চমৎকার। যার অন্যতম ভালোলাগার মতো হবে বাদুইজ্জাখুমের ভিতরে প্রবেশ। তবে সাঁতার না জানা ও সাপ বিচ্ছু ভয় পাওয়া পর্যটকরা এড়িয়ে চলুন। কারণ সাপের অন্যতম পছন্দের খাবার হলো বাদুড়।
# অবশ্যই স্থানীয় গাইড নিয়ে যাবেন। নতুবা পথ হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। রেললাইনের পাশে থাকা দোকানিদের সঙ্গে আলাপ করে গাইড জোগাড় করে নেওয়া যাবে।